চিকিৎসা নিতে গিয়ে দখল ৬০০ কোটি টাকার হাসপাতাল

চান্দিনায় চাঁদাবাজি না পেয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে আটক করে পুলিশের হাতে দিতে চেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়করা, তেমনি আরেক ঘটনায় ৬০০ কোটি টাকার হাসপাতালও দখল করে নিয়েছে এ সমন্বয়করা---- ছবি। দৈনিক আজকের কথা।
দেশের একমাত্র আধুনিক সরকারি চক্ষু হাসপাতাল জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বর্তমানে কার্যত চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের আহতরা দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি দখল করে রাখায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসহ হাসপাতালটি এখন একপ্রকার আবাসিক হোটেলে রূপ নিয়েছে।
গত ২৮ মে নিছক ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দেন জুলাই আন্দোলনের আহতরা। এরপর থেকে নিরাপত্তা শঙ্কায় কেউ হাসপাতালে আসছেন না। হাসপাতালের সব সেবা বন্ধ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ অনেকে চেষ্টা করেও বিষয়টির সমাধানে নিয়ে আসতে পারেননি।
এরই মধ্যে গত কয়েকদিন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সহকারী উপদেষ্টাসহ নানান পক্ষের তৎপরতায় দফায় দফায় বৈঠক হয়, তদন্ত কমিটি কাজ করে। অবশেষে গত ৩ জুন হাসপাতালের জরুরি বিভাগটি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি দেশসেরা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বলা হয়, মেডিকেল বোর্ড ৪ জুন হাসপাতাল পরিদর্শন করবে। একই সঙ্গে বোর্ড জুলাই আহতদের চিকিৎসা সমন্বয় এবং সামগ্রিক কার্যক্রম নির্ণয় করবে।
সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসমৃদ্ধ অত্যাধুনিক
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এ হাসপাতালটি এত দিন বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের (জুলাই আহতদের) কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কথা হলো, ‘আমরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবো? বলছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা
যেমন সিদ্ধান্ত তেমন কাজ। বন্ধের এক সপ্তাহ পর ৪ জুন পুলিশি পাহারায় যথারীতি জরুরি বিভাগ চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরাও পরিদর্শনে আসেন। তারা হাসপাতালে এসে ২০৭ নম্বর রুমে ভর্তি থাকা ৫৪ জন জুলাই আহতের সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈঠকে বসতে চান। আহতদের মধ্যে ৩০ জন তাদের ডাকে সাড়া দেন। তাদের সবার চোখ পরীক্ষা করেন বোর্ডের সদস্যরা। তাদের সবাইকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া এবং পুনর্বাসন করার সুপারিশ করে মেডিকেল বোর্ড। বাকি ২৪ জন হাজির না হওয়ায় তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারেননি।
মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা চলে যাওয়ার পর জরুরি বিভাগের সামনে আবাসিক চিকিৎসকের (আরএস) রুম থেকে হইহুল্লোড় শোনা যায়। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, জুলাই আহতরা চিকিৎসকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত।
এর মধ্যেই নিরাপত্তাজনিত কারণে আবাসিক চিকিৎসকসহ উপস্থিত কয়েকজন চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগ করেন। ভারপ্রাপ্ত পরিচালককে তাদের দাবির প্রতি সম্মতি দিয়েই পুলিশ প্রটোকলে বের হতে হয়। জুলাই আহতরা সাফ জানিয়ে দেন, ‘নানান কারণে আমাদের ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় এসে থাকবো কোথায়? এজন্য আমাদের পক্ষে হাসপাতাল ছাড়া সম্ভব নয়।’ এসময় জুলাই আহতরা তাদের রিলিজের যাবতীয় কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন।
এ নিয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালটির একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক এ হাসপাতালটি এত দিন বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের (জুলাই আহতদের) কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কথা হলো, ‘আমরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবো?’ তাদের থাকার জায়গা সরকার ভিন্ন কোথাও দিতে পারে। কিন্তু হাসপাতাল তো আবাসিক হোটেল বা লিল্লাহ বোর্ডিং হতে পারে না। এখানে জরুরি প্রয়োজনে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ‘জুলাই আহতদের কেউ কেউ এত দিন বলেছে, আমাদের চিকিৎসা ভালো নয়। সরকার এখন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের প্রধান, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চক্ষু বিভাগের প্রধান এবং ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ঢাকার বিভাগীয় প্রধানের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে দিলো। দেশসেরা এই চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসার বিষয়ে মতামত দিলেন। কিন্তু তারা এটাও মানে না।’
“অবশ্য, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে এসেও একজন জুলাই আহত হাসপাতালের পরিচালকের সামনে বলেন, ‘ওটা (মাউন্ট এলিজাবেথ) ভুয়া হাসপাতাল। আমাদের আমেরিকা বা ইউরোপ পাঠান’।” বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।
কী বলছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট মেডিকেল বোর্ড
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল ওয়াদুদ, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চক্ষু বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাঈল হোসেন এবং ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোমিনুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের যৌথ স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন গত ৪ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর জমা দেওয়া হয়।
তারা কিন্তু এরই মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ি চলে গেছে। এখন মাত্র ৭-৮ জন আছে। তাদের কেউ রিলিজ নেয়নি। যে যার মতো আবার এসে থাকবে, এমনটাই তাদের চাওয়া। তাই হাসপাতাল থেকে তারা রিলিজ নিতে চায় না।- ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম
প্রতিবেদনে চারটি মতামত তুলে ধরা হয়
১. রোগীদের প্রদত্ত চিকিৎসা এবং চলমান চিকিৎসা সন্তোষজনক; ২. আপাতত রোগীদের ছাড়পত্র দিয়ে প্রয়োজনে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের জন্য উপদেশ দেওয়া হলো; ৩. বিশেষ ক্ষেত্রে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ইস্পাহানি ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য উপদেশ দেওয়া হলো এবং ৪. তাদের অতিসত্বর যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য জোর সুপারিশ করা হলো।
‘সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ভারপ্রাপ্ত পরিচালক’
প্রতিবেদন মোতাবেক মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কাজ করতে গিয়ে সেদিন (৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ছিলেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম।
জানতে চাইলে ডা. জানে আলম বলেন, ‘গত বুধবার (৪ জুন) মেডিকেল বোর্ড এসেছিল। তখন হাসপাতালে ভর্তি ৫৪ জন জুলাই আহতের মধ্যে ৩০ জন বোর্ডের ডাকে সাড়া দেয়। চিকিৎসাপত্র ও নানাবিধ রিপোর্ট দেখে বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয়, তাদের হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। তারা বাড়ি চলে যাবে। সমস্যা হলে ফলোআপ করবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা সব কাগজপত্র রেডি করেছিলাম। কিন্তু তারা মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত মানেনি। তারা তাদের মতো থাকবে। কোনো অর্ডার মানবে না। তাদের কথা হচ্ছে, এখানে বসে ওরা ওদের বার্গেনিং করবে। সরকার থেকে নানান দাবি আদায় করে নেবে।’
ডা. জানে আলম বলেন, ‘ওইদিন তো তারা (জুলাই আহতরা) আমাকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পরে আমি তাদের দাবির প্রতি সহমত প্রকাশ করে পুলিশের সহায়তায় বেরিয়ে এসেছি।’
বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। এ ঘটনায় সারাদেশে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। মাত্র কয়েকজন আহতের বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে সারাদেশে জুলাই আহত ও পঙ্গুদের ত্যাগ বিতর্কিত হচ্ছে।- সমন্বয়ক
‘তারা কিন্তু এরই মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ি চলে গেছে। এখন (৬ জুন রাত পর্যন্ত) মাত্র সাত-আটজন আছে। তাদের কেউ রিলিজ নেয়নি। যে যার মতো আবার এসে থাকবে, এমনটাই তাদের চাওয়া। তাই হাসপাতাল থেকে তারা রিলিজ নিতে চায় না’- যোগ করেন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলো, জুলাই আহতদের হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই। আবার হাসপাতালে থেকেও তাদের চিকিৎসা হচ্ছে না, যেহেতু হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বন্ধ। তাহলে তারা এখন কী হিসেবে সেখানে থাকছে? আবাসিক হোটেল বা লিল্লাহ বোর্ডিং হিসেবে কি না—জানতে চাইলে ডা. জানে আলম বলেন, ‘ওই রকমই। তাদের ঢাকায় থাকা দরকার। এখন হাসপাতালকে বেছে নিয়েছে থাকার জন্য।’
চক্ষু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতদের মধ্যে একজন হলেন কুষ্টিয়ার মো. কোরবান শেখ হিল্লোল। তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এই গ্যাঞ্জামটা আমাদের ছিল না। আমাদের দাবি-দাওয়া অনেকবার দিয়েছি। আমার মনে হয়, আহতরা আর দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলবে না। সারা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের খালি দাবি দাবি দাবি। দেশটা আমার আপনার সবার ভাই। মানবতার দিক দিয়ে কেউ না কেউ ছাড় না দিলে দেশটা আগাবে কী করে ভাই? আর কত দাবি দেব ভাই? চিকিৎসা, পুনর্বাসন, এ ও বলে বলে, আপনারা নিজেরাও তো জানেন। প্রত্যেকটা জায়গায় তো একই কথা। আমরা এ ব্যাপারে আর কথা বলব না এ রকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার, দেশ যেটা ভালো মনে করে করুক।’
হাসপাতাল আবার চালু হোক, এ বিষয়টি মেডিকেল বোর্ডকে বলেছেন কিনা? জবাবে হিল্লোল বলেন, ‘গত কয়েকদিন যাবৎ আমরা বলেছি, যারা আসছিলেন তাদের কাছে আমরা রিকোয়েস্ট করেছি। আমাদের ট্রিটমেন্ট রিলেটেড ব্যাপারগুলো নিয়ে আপনারা কী করবেন, এটা আপনাদের ব্যাপার। বাট পাবলিক যারা আই হসপিটাল হিসেবে এখানে আসেন, তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সবার। তারা সহমত হয়েছেন যে না এটা দরকার।’
নেপথ্যে পাঁচ কারণ
জুলাই আহতরা কেন চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও হাসপাতাল ছাড়ছেন না—এ নিয়ে অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক, কর্মচারী, রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এবং একাধিক দিন সরেজমিনে পরিদর্শন করে এই কারণগুলো জানা গেছে।
১. সেটেল হওয়ার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়া অথবা যথাযথ পুনর্বাসনের আশায় তারা হাসপাতালে থাকছেন। তাদের ধারণা, হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলে সরকার বা কর্তৃপক্ষের নজর তাদের দিকে থাকবে না।
২. জুলাই আহতদের মধ্যে দু-একজন অর্থের বিনিময়ে অন্য রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি, অপারেশনের সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়াসহ নানান তদবিরে জড়িয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ সেখানে বসে ওই হাসপাতালসহ ঢাকার অন্য হাসপাতালগুলোর নিয়োগ ও টেন্ডারে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন। জোটবদ্ধ হয়ে হাসপাতাল ও বিভিন্ন দপ্তরে যাচ্ছেন।
৩. হাসপাতালে অবস্থান করা দু-একজনের যাওয়ার মতো জায়গাও নেই। তারা বউ-বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে থাকেন। একজনের নামে দুই থানায় মাদক মামলা আছে, অভিযোগপত্র দাখিলও হয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে চলে গেলে গ্রেফতারের ভয় আছে তার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিক যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে যোগ দেন এই হাসপাতালে অবস্থান করা আহতরা। যে কারণে তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না ছাত্র সমন্বয়করাও।
৪. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিক যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে যোগ দেন এই হাসপাতালে অবস্থান করা আহতরা। যে কারণে তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না ছাত্র সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতারাও।
৫. জুলাই আন্দোলনে এই আহতদের অনেকের বাড়ি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়। তাদের জুলাই ফাউন্ডেশনসহ নানান জায়গার কাজে ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় তাদের থাকার জায়গা নেই। তাই হাসপাতালটিতে দখলে রাখা সিট তারা ছাড়তে চায় না। এখানে যখন-তখন যেন এসে থাকা যায়, খাওয়াও পাওয়া যায়—এটিই তারা চান।
এরকম অন্তত পাঁচটি কারণে হাতেগোনা কয়েকজন অন্য জুলাই আহতদের নানাভাবে বুঝিয়ে হাসপাতাল দখলে রাখতে উদ্বুদ্ধ করছেন। আহতদের মধ্যে যারা বাড়িতে আছেন তাদেরও এই হাসপাতালে এসে সিট দখল নেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তারা অন্যদের বলছেন, সরকার জুলাই আহতদের দুই হাজার ৬০০ ফ্ল্যাট দেবে। ঢাকায় থাকলে ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে। চলে গেলে দেবে না।
এই জুলাই আহতরা অন্য সুযোগ-সুবিধাও একে অন্যের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন। বিভিন্ন সহযোগিতার অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে গ্রুপ, সাব-গ্রুপও হয়েছে। মাঝেমধ্যে হাসপাতালের ভেতরে নিজেরাই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
একজনেরও হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই: পরিচালক
ছুটিতে থাকা হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি যে, তারা (জুলাই আহত) অনেক বড় স্যাক্রিফাইস করেছে। তাদের অনেকের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত, অনেকের এক চোখ ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা সাধ্যের পুরোটা দিয়েই চিকিৎসা দিয়েছি। এমনকি যাদের প্রয়োজন তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি। বিদেশ থেকে বিখ্যাত ডাক্তারদের এনেও চিকিৎসা করিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘তাদের এখন প্রয়োজন পুনর্বাসন। সেটিও মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় বলেছি। সমন্বিত প্রচেষ্টা চলমান। এরই মধ্যে পরপর কয়েকটি ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। যেসব ঘটনায় আমরা বিব্রত। তারপরও তাদের মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছিলাম। সর্বশেষ গত ২৮ মে তারা যেভাবে চিকিৎসক ও স্টাফদের গায়ে হাত তুলেছে, এতে তারা (ডাক্তার-স্টাফ) অনিরাপদ বোধ করছেন। হাসপাতালে আসতে চাইছেন না।’
‘জুলাই আহতদের চিকিৎসাটা এখন মূলত ফলোআপ বা চলমান চিকিৎসা। এজন্য তাদের এনআইওর (জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল) মতো বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। যার যার এলাকায় ফেরত যেতে পারে। তাদের অসুস্থতার সিমটম দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মেডিকেল কলেজগুলোর চক্ষু বিভাগে যাবে, সেখানে তাদের সেবা দিতে পারবে।’
অধ্যাপক ডা. খায়ের আরও বলেন, ‘যদি ওই হাসপাতাল মনে করে অস্ত্রোপচার লাগবে বা বিশেষায়িত কোনো সেবা লাগবে, তারা এনআইওতে রেফার করবে। আমরা সেটা করে দেবো। অথবা সরকার যদি মনে করে তাদের ঢাকার হাসপাতালে রেখেই সেবা দেবে, তাহলে অন্য হাসপাতালে শিফট করতে হবে।’
কাজটা সহজ নয়, আমরা চেষ্টা করছি: স্বাস্থ্য সচিব
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা কীভাবে চালু করা যায়, চেষ্টা হচ্ছে। আহতদের বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া এবং পুনর্বাসনের দাবির বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট। আমরা চেষ্টা করছি, যাদের বিদেশ যাওয়া প্রয়োজন, যাবে। পুনর্বাসন কমন দাবি, কিন্তু একেকজনের একেকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে, কাজটা সহজ নয়। আমরা চেষ্টা করছি।’
মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তও তো জুলাই আহতরা মানে না, এখন কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি সময় নিয়ে ভাবছি। যেহেতু ঈদের ছুটিতে তারা বেশিরভাগ চলে গেছে। এ মুহূর্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি। এটা খুবই সংবেদনশীল ব্যাপার। গত ৪ জুনের ঘটনা আপনারা জানেন, আমরাও জানি। আমরা চেষ্টা করছি, ঈদের পর পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক করা যায়।’
প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। এ ঘটনায় সারাদেশে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। মাত্র কয়েকজন আহতের বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে সারাদেশে জুলাই আহত ও পঙ্গুদের ত্যাগ বিতর্কিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্র সমন্বয়কদের সমন্বয়ে সম্মিলিতভাবে কঠিন সিদ্ধান্তে আসা দরকার। এভাবে চলতে পারে না। চলতে দেওয়া যায় না।’
ঈদের আগের দিন (৬ জুন) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি জুলাই আহত ৫৫ জনের মধ্যে মাত্র চারজন এখনো অবস্থান করছেন। তাদের সঙ্গে ভর্তি ছাড়া বহিরাগত আছেন তিনজন। অন্যরা বাড়ি চলে গেছেন। কিন্তু বাড়ি গেলেও তারা রিলিজ নেননি। তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে এসে আবার এখানে থাকবেন।
যেভাবে হামলা-মারধরের সূত্রপাত
কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে গত ২৮ মে কর্মবিরতি পালন করেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জরুরি বিভাগ ছাড়া নিয়মিত অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে সব চিকিৎসাসেবা বন্ধ ছিল। যে কারণে সকাল থেকেই হাসপাতালে আসা সাধারণ রোগী ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কর্মীদের কথা কাটাকাটি হয়। বেলা সাড়ে ১১টার পর চিকিৎসক ও রেজিস্ট্রার মাহফুজ আলম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে যাদের পূর্বনির্ধারিত অস্ত্রোপচারের তারিখ ছিল, তাদের পরে ফোনে ডেকে এনে অস্ত্রোপচার করে দেবেন বলে জানান। এতেও সেবাপ্রার্থীরা নিবৃত হননি। তারা হইহুল্লোড় ও হট্টগোল করতে থাকেন। চিকিৎসক ও নার্সদের দিকে তেড়ে যান। এসময় আনসার সদস্যরা নিবৃত করতে গেলে হাতাহাতি হয়। হাসপাতালের কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে মারামারিও হয়।
এরপর পুরো হাসপাতালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ভেতরের সব ওয়ার্ডের কলাপসিবল গেট আটকে তালা দিয়ে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। বিষয়টি নিজেদের জন্য আতঙ্কের বা আক্রমণাত্মক হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উল্টো তালা ভেঙে জুলাই আহতরা লাঠিসোঁটা ও রড হাতে চিকিৎসক, কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করেন। তাদের সঙ্গে এসে সেই হামলায় যোগ দেন পঙ্গু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতরাও।
এ ঘটনায় চিকিৎসকসহ ১৫ জন আহত হন। এরপর আতঙ্কে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের বেশিরভাগ দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে যান। তাদের কেউ কেউ ভেতরে আটকা পড়লে সেনাসদস্যরা গিয়ে উদ্ধার করেন। এরপরই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। কার্যত ওইদিন থেকে পুরো হাসপাতাল জুলাই আহতদের দখলে চলে যায়। এরপর থেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন না চিকিৎসক-নার্সসহ অন্য কর্মীরা। সেখানে এখন শুধু জুলাই আহতরা অবস্থান করছেন। সরকার রুটিনমাফিক তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করছে।
চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর জুলাই আহতদের হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোরবান শেখ হিল্লোল বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী মানুষ কী বললো এর সঙ্গে সত্যের সংশ্লিষ্টতা নাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এই হাসপাতালে আছি। আমরা জানি প্রত্যেকটা জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। দ্বিতীয় কথা, এখানে একটা বাহিনী আছে, আনসার বাহিনী, যারা অলটাইম এখানে নিরাপত্তায় থাকে। তৃতীয় কথা হচ্ছে এখানে শেরেবাংলা নগর থানার ওসিসহ যার টিম ছিল তারা আন্দোলনের শুরু থেকে ছিল। তারা আমরা, সবাই মিলে যদি একটা কথা বলে, আর এক গ্রুপ যদি একটা কথা বলে এর কোনো ভিত্তি নেই। এসব বাজে কথার কোনো ভিত্তি নেই।’
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
র্যাবিস প্রতিরোধে জোরদার কার্যক্রম
বাগেরহাটে জলাতঙ্ক ঠেকাতে কুকুরে টিকা অভিযান, তিন মাসে ৭ হাজার ৫০০ মানুষ আক্রান্ত

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় পৌরসভার বিশেষ উদ্যোগ
কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে বাগেরহাট পৌর এলাকায় বেওয়ারিশ ও গৃহপালিত কুকুরকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শহরে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কুকুরের কামড়ে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ উদ্যোগ নিয়েছে বাগেরহাট পৌরসভা।
বুধবার দুপুরে বাগেরহাট পৌরসভা চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসুম, ভ্যাকসিনেশন বিশেষজ্ঞ ও ডগ এক্সপার্ট টিমের সদস্য সায়মনসহ পৌরসভার বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

কুকুরের টিকাদানের মাধ্যমে জলাতঙ্কের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। কার্যক্রমটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিন মাসে টিকা নিয়েছেন ৭ হাজার ৫০০ মানুষ
বাগেরহাটে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে এমন উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা কতটা তীব্র, তা স্পষ্ট হয়েছে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট হাসপাতালের চিকিৎসা পরিসংখ্যানে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসে অন্তত ৭ হাজার ৫০০ মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা নিতে হাসপাতালে এসেছেন।
এ বিপুল সংখ্যক মানুষের কুকুরের কামড়ের শিকার হওয়ার ঘটনা স্থানীয় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের বিচরণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও পথচারীদের মধ্যে বেওয়ারিশ কুকুরের দলবদ্ধ চলাচল নিয়ে আতঙ্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বেওয়ারিশের পাশাপাশি গৃহপালিত কুকুরও পাবে টিকা
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, এ কর্মসূচির আওতায় শুধু বেওয়ারিশ কুকুর নয়, গৃহপালিত কুকুরকেও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হবে।
এর ফলে শহরের কুকুরের একটি বড় অংশকে টিকাদানের আওতায় আনার মাধ্যমে জলাতঙ্কের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচি বাস্তবায়নে ফেনী থেকে অভিজ্ঞ ‘ডগ এক্সপার্ট টিম’-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাগেরহাট পৌরসভা। বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, জনবহুল এলাকা ও কুকুরের বিচরণস্থলে গিয়ে কুকুর শনাক্ত করে টিকা দেবেন।
এ সময় টিমের সদস্যরা কুকুর ধরার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সতর্কতা অবলম্বন করবেন।
কুকুরের কামড়ের আতঙ্ক কমাতে বড় পদক্ষেপ
দীর্ঘদিন ধরেই বাগেরহাট পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে অভিযোগ করে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শহরের বিভিন্ন সড়ক, বাজার, আবাসিক এলাকা ও জনসমাগমস্থলে দলবদ্ধ কুকুরের চলাচল অনেক সময় পথচারীদের জন্য ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে হঠাৎ কুকুর তাড়া করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল—বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সেগুলোকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার আওতায় আনা।
পৌরসভার বর্তমান উদ্যোগে সেই দাবির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
শুধু কুকুরকে টিকা দিলেই শেষ নয়
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুরকে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও মানুষের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কোনো ব্যক্তি কুকুরের কামড়ের শিকার হলে দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা, প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নির্ধারিত সময়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাগেরহাটে তিন মাসে ৭ হাজার ৫০০ মানুষের টিকা গ্রহণের তথ্যই বলে দেয়, কুকুরের টিকাদানের পাশাপাশি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত টিকা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
নজরদারি ও ধারাবাহিকতা চান নাগরিকরা
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, উদ্বোধনের মধ্যেই যেন কর্মসূচির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না থাকে। পৌর এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডের কুকুরকে টিকাদানের আওতায় আনা এবং পরবর্তীতে নিয়মিতভাবে টিকাদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে টিকা দেওয়া কুকুর শনাক্তকরণ, পরবর্তী পর্যায়ে পুনরায় টিকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা পর্যবেক্ষণ এবং নতুন বেওয়ারিশ কুকুরের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, একবারের কর্মসূচির চেয়ে ধারাবাহিক টিকাদান ও নজরদারিই জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
জনসম্পৃক্ততা জরুরি
পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কর্মসূচি চলাকালে নাগরিকদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদানকারী দল কোনো এলাকায় কাজ করার সময় তাদের কাজে বাধা না দিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করার জন্য নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
গৃহপালিত কুকুরের মালিকদেরও নিজেদের পোষা প্রাণীকে টিকার আওতায় আনতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বাগেরহাটে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে নতুন অধ্যায়
কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে হাজার হাজার মানুষের চিকিৎসা নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বাগেরহাট পৌরসভার এ উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একদিকে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান, অন্যদিকে গৃহপালিত কুকুরকে টিকার আওতায় আনা—দুই দিক থেকে কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করা গেলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
তবে কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে টিকাদান কার্যক্রমকে নিয়মিত ও ধারাবাহিক করতে হবে। পাশাপাশি কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত মানুষের জন্য দ্রুত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রমও জোরদার করতে হবে।
বাগেরহাট পৌরসভার এ উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু কুকুরের মাধ্যমে জলাতঙ্কের বিস্তার রোধই নয়, নগরবাসীর নিরাপদ চলাচল ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
কৃষকের স্বস্তি, দখলদারদের আতঙ্ক
মুরাদনগরে ড্রেজার সিন্ডিকেটে এসিল্যান্ডের হানা—৮ লাখ টাকা জরিমানা, ৪ ড্রেজার ও ২৮০০ ফুট পাইপ অপসারণ

কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর প্রশাসন, সরকারি রাস্তা দখলমুক্তের উদ্যোগ; ‘ড্রেজার-দখলদারদের কাছে এসিল্যান্ড এখন আতঙ্কের নাম’
কুমিল্লার মুরাদনগরে কৃষিজমির বুক চিরে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে উপজেলা প্রশাসন। সংঘবদ্ধ ড্রেজারচক্রের বিরুদ্ধে দিনব্যাপী অভিযানে একটি ড্রেজারের মালিককে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই অভিযানে তিনটি ড্রেজার ও প্রায় ২ হাজার ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়েছে। পৃথক অভিযানে আরও একটি ড্রেজার ও প্রায় ৮০০ ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন, রাস্তা দখল এবং অন্যের জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগেও প্রশাসনিক পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের দখল, অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন ও কৃষিজমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে এবার মুরাদনগরে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সরকারের সকল সম্পত্তি, কৃষিজমির উর্বরতা ও টপ সয়েল রক্ষায় প্রশাসন শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। অবৈধভাবে ড্রেজার চালিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে।
ড্রেজার সিন্ডিকেটে বড় আঘাত
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) মুরাদনগর উপজেলার পূর্ব ধইর পশ্চিম ও দারোরা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সাকিব হাছান খাঁন।
অভিযানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাঙ্গরা বাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শফিউল আলম, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বাঙ্গরা বাজার থানা এলাকার পূর্ব ধইর পশ্চিম ইউনিয়নের মালিপাড়া ও নবীয়াবাদ এলাকায় কৃষিজমিতে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানকালে কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ায় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনে এক ড্রেজার ব্যবসায়ীকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে তিনটি ড্রেজার এবং প্রায় ২ হাজার ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়।
প্রশাসনের এ অভিযানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কৃষিজমিতে ড্রেজার বসিয়ে মাটি ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

দারোরা ইউনিয়নেও ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান
অন্যদিকে মুরাদনগর থানাধীন দারোরা ইউনিয়নের বরই বাগান এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি ড্রেজার ও প্রায় ৮০০ ফুট পাইপ অপসারণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে নেওয়ার ফলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃষিজমি পরিণত হচ্ছে গভীর গর্তে। বর্ষাকালে এসব গর্তে পানি জমে কৃষিকাজ আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
কৃষকদের ভাষ্য, একটি জমি থেকে একবার টপ সয়েল তুলে নেওয়া হলে তার স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৃষি উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারি রাস্তা দখলের অভিযোগেও নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন
ড্রেজারবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি সরকারি রাস্তা দখল ও অন্যের জমি দখলের অভিযোগেও প্রশাসনের তৎপরতা শুরু হয়েছে।
দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. নায়েব আলী মেম্বারের বিরুদ্ধে প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো একটি সরকারি রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন করে জায়গাটি দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই জায়গায় বাড়ি নির্মাণের জন্য প্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে।
একই এলাকার একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যের ক্রয়কৃত জমিও দখলে নিয়ে সেখানে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা ভূমি প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সরকারি রাস্তা উদ্ধারের পাশাপাশি অবৈধভাবে দখলে থাকা জমি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
‘রাস্তা দখল করে পুকুর, মাছের প্রকল্প—এবার নজরদারি চাই’
এদিকে মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারি রাস্তার পাশে পুকুর খনন, মৎস্য প্রকল্প বা ব্যক্তিগত স্থাপনা তৈরির মাধ্যমে সরকারি রাস্তার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত বা সংকুচিত করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও রাস্তার পাশ ঘেঁষে পুকুর খনন করা হচ্ছে, কোথাও রাস্তার জায়গা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত প্রকল্প পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে সরকারি রাস্তার স্থায়িত্ব নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানুষের চলাচল ও যানবাহন ব্যবস্থাপনায়ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কৃষিজমি রক্ষায় যেভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, একইভাবে সরকারি রাস্তা, খাসজমি ও সরকারি স্থাপনা রক্ষায়ও নিয়মিত অভিযান প্রয়োজন।
তাদের প্রত্যাশা, রাস্তার জায়গা দখল, রাস্তার গতিপথ পরিবর্তন কিংবা রাস্তার পাশে অবৈধভাবে পুকুর ও মৎস্য প্রকল্প গড়ে তুলে সরকারি সম্পদের ক্ষতি করা হলে সেসব ক্ষেত্রেও দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসিল্যান্ড অফিস নিয়ে বদলাচ্ছে মানুষের ধারণা
১৯৮৩ সালে মুরাদনগর উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উপজেলা ভূমি অফিস তথা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ভূমি রাজস্ব, সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, ভূমি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে।
তবে স্থানীয় অনেকের মতে, ভূমি অফিসের এসব দায়িত্ব ও এখতিয়ার সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন তেমন সচেতনতা ছিল না। ফলে সরকারি জমি, রাস্তা, কৃষিজমি কিংবা ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মুরাদনগরে ড্রেজারবিরোধী অভিযান, কৃষিজমি রক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, ‘এসিল্যান্ড অফিস শুধু ভূমি সংক্রান্ত কাগজপত্রের দপ্তর নয়—সরকারি সম্পত্তি ও সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।’
‘দখলদারদের কাছে যমদূত মুরাদনগরের এসিল্যান্ড সাকিব হাছান খাঁন’—স্থানীয়দের প্রশংসা
ড্রেজারবিরোধী অভিযান ও সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে যেসব এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কৃষিজমি থেকে মাটি-বালু উত্তোলন, রাস্তা দখল কিংবা সরকারি সম্পত্তি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
স্থানীয়দের একাংশ বর্তমান সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব হাছান খাঁনের সাম্প্রতিক কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে সরাসরি অভিযান এবং আইন প্রয়োগের কারণে অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ী ও ভূমি দখলের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।
কেউ কেউ তাঁকে রীতিমতো ‘ড্রেজার, ভূমিদখল ও সরকারি সম্পত্তি দখলদারদের জন্য যমদূত’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন। তবে এটি স্থানীয়দের মন্তব্য; প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যক্তিকে এ ধরনের বিশেষণে অভিহিত করা হয়নি।
কৃষিজমি বাঁচাতে এখনই কঠোর নজরদারি জরুরি
কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে মাটি বা বালু উত্তোলনের কারণে শুধু একটি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৃষকের ভবিষ্যৎ আয়, জমির উৎপাদনক্ষমতা এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি বা টপ সয়েলই মূলত জৈব উপাদান ও উর্বরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বহন করে। এ স্তর নির্বিচারে সরিয়ে ফেললে জমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।
মুরাদনগরের মতো কৃষিনির্ভর এলাকায় তাই অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন নিয়মিত নজরদারি, অভিযোগ যাচাই, দ্রুত আইন প্রয়োগ এবং অভিযানের পর পুনরায় একই স্থানে ড্রেজার বসানো হচ্ছে কি না—তা পর্যবেক্ষণ করা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বর্তমান প্রশাসনের অভিযান যেন বিচ্ছিন্ন কোনো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কৃষিজমি, সরকারি রাস্তা, খাসজমি, সরকারি স্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের বৈধ মালিকানাধীন জমি রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালিত হোক।
প্রশাসনের অভিযানকে স্বাগত, দাবি নিয়মিত অভিযানের
মুরাদনগরে সাম্প্রতিক অভিযানে একটি ড্রেজার ব্যবসায়ীকে ৮ লাখ টাকা জরিমানা, জরিমানা অনাদায়ে কারাদণ্ড, একাধিক ড্রেজার ও বিপুল পরিমাণ পাইপ অপসারণ এবং সরকারি রাস্তা উদ্ধারের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ভূমি প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে কৃষিজমি রক্ষা, অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ, সরকারি রাস্তা দখলমুক্ত এবং সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন।
তাদের প্রত্যাশা, মুরাদনগরে অবৈধ ড্রেজিং ও ভূমিদখলের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই কঠোর অভিযান যেন কোনোভাবেই থেমে না যায়।
কারণ কৃষিজমি একবার ধ্বংস হলে শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো এলাকার কৃষি অর্থনীতি। আর সরকারি রাস্তা ও সম্পত্তি দখল হলে ক্ষতি হয় জনগণের সম্পদের। তাই এসব রক্ষায় মাঠ প্রশাসনের কঠোর, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।
রেল যোগাযোগে খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
মোংলা-ঢাকা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন, বদলে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগচিত্র

রেল যোগাযোগে খুলছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার
মোংলা-ঢাকা রুটে একজোড়া নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দীর্ঘদিনের যাতায়াত সংকট নিরসনের পাশাপাশি মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ২৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত মাসিক পর্যালোচনা সভায় মোংলা-ঢাকা রুটে একজোড়া আন্তঃনগর ট্রেন চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় দেশের বিভিন্ন রেলপথে যাত্রীসেবা সম্প্রসারণ ও রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর করার বিষয়ে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মোংলা-ঢাকা রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। এতে মোংলা বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যও আরও গতিশীল হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোংলা বন্দর ও রাজধানী ঢাকার মধ্যে সরাসরি যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতেই নতুন ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোংলা দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কিন্তু রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে প্রধানত সড়কপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। যানজট, দীর্ঘ যাত্রাসময় ও তুলনামূলক বেশি পরিবহন ব্যয়ের কারণে এ রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী মানুষকে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়।
নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু হলে মোংলা, বাগেরহাটসহ আশপাশের এলাকার মানুষের রাজধানীতে যাতায়াত আরও সহজ, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ বাড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রেলওয়েতে আরও একাধিক উদ্যোগ
শুধু মোংলা-ঢাকা রুট নয়, দেশের সামগ্রিক রেলসেবা সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যেও ওই সভায় একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় নাজিরহাট লোকাল ট্রেনকে কমিউটার ট্রেনে উন্নীত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জামালপুর এক্সপ্রেসকে সার্কুলার রুটে চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া নরসিংদী কমিউটার ট্রেনের অব্যবহৃত রেক ব্যবহার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত নতুন একজোড়া কমিউটার ট্রেন চালুর বিষয়ে কারিগরি মতামত চাওয়া হয়েছে।
রেলওয়ের এসব উদ্যোগকে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় রেলকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমবে সড়কের চাপ, বাড়বে অর্থনৈতিক গতি
মোংলা-ঢাকা রুটে নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু হলে সড়কপথের ওপর যাত্রীচাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি হবে। বিশেষ করে মোংলা বন্দরের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ আরও গতিশীল হলে পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও পরোক্ষ সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সিদ্ধান্তটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করে বাস্তবে ট্রেন চলাচল শুরু হলে মোংলা ও দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ হবে।
মোংলা-ঢাকা রেল যোগাযোগের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে উঠতে পারে।




























